পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস

নতুন প্রজন্মের সর্বাধুনিক চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ যুক্ত হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে। আর এ বিমানগুলো দিয়েই পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া আকাশবীণা, হংসবলাকা, গাঙচিল ও রাজহংস নামের এই উড়োজাহাজগুলো দিয়ে নতুন রুট এবং ইউরোপসহ দূরপাল্লার বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটগুলো চালু করতে চায় জাতীয় পতাকাবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটি। শিগগিরই বিশ্বের সবচেয়ে জ্বালানিসাশ্রয়ী এ চারটি ড্রিমলাইনার বিমান বাংলাদেশের বহরে যুক্ত হবে। এর মধ্যে প্রথম বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আসছে এ বছরের আগস্টে এবং দ্বিতীয়টি আসবে নভেম্বরে। বাকি দুটি ড্রিমলাইনার আসবে ২০১৯ সালের নভেম্বরে।

দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট সর্বাধুনিক এই উড়োজাহাজে আসনসংখ্যা হবে ২৭১। আর ড্রিমলাইনারে জ্বালানি বোয়িং ৭৬৭ উড়োজাহাজের চেয়ে ২০ শতাংশ কম লাগবে। এতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থার সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছেন বিমানের কর্মকর্তারা।

বিমান সূত্র জানায়, ২০০৭ সালের ৮ জুলাই প্রথম ড্রিমলাইনার সরবরাহ শুরু হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০০৮ সালে চারটি ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িং কম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালে এই উড়োজাহাজ বিমানকে সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু বিমানবহরে আধুনিক উড়োজাহাজ যুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে নির্ধারিত সময়ের আগেই বোয়িং কম্পানি ২০১৯ সালের মধ্যেই চারটি ড্রিমলাইনার বিমান সরবরাহ করতে সম্মত হয়।

জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ গতকাল বিকেলে বলেন, ‘আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রথম বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজটি আসার কথা। এই উড়োজাহাজ দিয়ে লন্ডন রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো হবে। এ ছাড়া বর্তমানে দোহাতে আমরা ফ্লাই গ্লোবালের কাছ থেকে ভাড়া করা উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছি। সেখানেও আমরা নিজস্ব ড্রিমলাইনার দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করব। কুয়েত, মদিনাতেও ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা আছে। এ ছাড়া এর মধ্যে গুয়াংজু, কলম্বো এবং মালের পথে উড়বে বিমান। তিনি জানান, দ্বিতীয় ড্রিমলাইনার দিয়ে ম্যানচেস্টার, রোম, সিডনি, মন্ট্রিয়ল, দিল্লি, হংকং, ও টোকিওতে উড়াল দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে বিমানের। ’

সূত্র জানায়, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি হালকা যৌগিক পদার্থ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এভিয়েশনশিল্পে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জ্বালানিসাশ্রয়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বোয়িং ৭৮৭ কে ৭৬৭ এর চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানিসাশ্রয়ী করে ডিজাইন করা হয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন : ইলেকট্রিক্যাল ফ্লাইট সিস্টেম, চার প্যানেলবিশিষ্ট উইন্ডশিল্ড, শব্দ নিরোধী শেভরন ইত্যাদি বিমানটিকে অনন্য করে তুলেছে। ড্রিমলাইনার একবার তেল নিয়ে একটানা ১৬ ঘণ্টা উড়ালে সক্ষম। বাংলাদেশ ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-১ এ উন্নীত হবে এই আশায় ড্রিমলাইনার নেওয়া হয় মূলত ঢাকা-নিউ ইয়র্ক নন স্টপ ফ্লাইটের জন্য। কিন্তু ২০০৮ সালে যখন বোয়িংকে ড্রিমলাইনারের অর্ডার দেওয়া হয় তখন বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আশা করেছিল ১০ বছরে বাংলাদেশ ক্যাটাগরি-১ এ উন্নীত হবে এবং ঢাকা-নিই ইউর্ক ফ্লাইট চালু হবে, কিন্তু বিমানের সেই আশা পূরণ হয়নি বলে জানান বিমান বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।

আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড্রিমলাইনারের উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছে বিমান বাংলাদেশ। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের এই উড়োজাহাজের উড্ডয়নকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সেলিব্রিটিদের নিয়ে ঢাকার আকাশে ২ ঘণ্টার ‘সিনিক ট্যুর’ করারও পরিকল্পনা আছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের।

বিমান বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, বিমানবহরে আছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০। ভাড়ায় নেওয়া দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর, দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, একটি এয়ারবাস এ৩৩০, দুটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ। ১৩টি উড়োজাহাজ দিয়ে ১৫টি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সাতটি আকাশপথে চলাচল করছে বিমান। নতুন উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার দিয়ে বিমান আবারও সক্ষমতা ফিরে পাবে আশা করা হচ্ছে। এ জন্য চার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া ড্রিমলাইনার পরিচালনায় ১৪ জন পাইলটকে বোয়িং থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও (ভারপ্রাপ্ত) ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল বলেন, ‘বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার দিয়ে আমরা নতুন এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটগুলো ফের চালু করতে পারব। আমরা আশা করছি, ড্রিমলাইনারের মাধ্যমে বৈশ্বিক এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে বিমান আরো প্রতিযোগিতা করতে এবং যাত্রীদের আরো উন্নতমানের সেবা দিতে পারেবে। ’

ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের নানা দিক সম্পর্কে জানাতে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ট্রেনিং সেন্টারে সাংবাদিকদের জন্য একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সেখানে জানানো হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৩ হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়ে যেতে পারবে স্টেট অব দ্য আর্ট প্রযুক্তির ড্রিমলাইনার। ড্রিমলাইনারে বসে ওয়াই-ফাই সুবিধা পাওয়া যাবে। এ সুবিধা এখন পর্যন্ত দিচ্ছে বিশ্বের ৫৪টি বিমান সংস্থা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনসে এ সুবিধা পাওয়া যায়। এতে চাইলেই যখন তখন আপনজনের কাছে ফোন করা যাবে। এ জন্য বিশেষ এক ধরনের ফোনসেট দেওয়া হবে যাত্রীদের। ড্রিমলাইনারে থাকছে বিশ্বমানের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেম (আইএফই)। এর মাধ্যমে ক্ল্যাসিক থেকে ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র দেখা যাবে। বিভিন্ন ধরনের সুর-সংগীত শোনা তো যাবেই। ভিডিও গেমসও আছে। এর পাশাপাশি বিশ্বসেরা ৯টি টিভি চ্যানেলের রিয়াল টাইম লাইভ দেখা যাবে। এ জন্য প্যানাসনিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। রাতের বেলা যখন ড্রিমলাইনার চলতে থাকবে আকাশে, তখন এর কেবিন থাকবে শান্ত-নির্জন। কেবিনের পরিবেশ অনুযায়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো জ্বলবে। মোট ২৭১ জন যাত্রী বহন করতে পারবে ড্রিমলাইনার। এর মধ্যে ২৪টি আসন বিজনেস ক্লাসের। বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, ঢাকায় বিমানের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে ড্রিমলাইনারের যোগাযোগ থাকবে সব সময়।

image_printপ্রিন্ট

শেয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।