লাশ গোসল করানোর সময় পরিবার দেখতে পায় মৃত নবজাতকটি একটি ছেলেশিশু;তাদের সন্তান ছিল ‘মেয়ে..

তিন দিন চিকিৎসার পর হঠাৎ বলা হয় আপনাদের বাচ্চা মারা গেছে। বাচ্চা বিকৃত হয়ে গেছে। তাই মাকে দেখতে দিবেন না। ভালো করে প্যাকেট মোড়ানো হয়েছে, এভাবেই বাড়ি নিয়ে গিয়ে দাফন করে ফেলবেন। ইনফেকশন হয়েছে, মা দেখলে ভয় পাবে।’ শিশুটির স্বজনদের হাসপাতাল থেকে এভাবেই বলা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামের বিশেষায়িত ‘চাইল্ড কেয়ার’ হাসপাতাল থেকে লাশ বুঝে নিয়ে শিশুর পরিবার অ্যাম্বুল্যান্সে করে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছে বিকেলে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশ গোসল করানোর সময় পরিবার দেখতে পায় মৃত নবজাতকটি একটি ছেলেশিশুর। তাদের সন্তান ছিল ‘মেয়ে’ নবজাতক। পরিবার লাশ দাফন না করে আবারও নিয়ে আসে চট্টগ্রামে। থানা-পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করে তাদের জীবিত কন্যাশিশু।

জানা যায়, মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীতে এসেই স্বজনরা পাঁচলাইশ মডেল থানায় ঘটনাটি জানায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং গতকাল বুধবার সকাল ৮টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জীবিত কন্যাশিশুকে মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেয়। শিশুটিকে তাৎক্ষণিক ওই হাসপাতাল থেকে বের করে এনে ভর্তি করা হয়েছে নগরীর বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে। শিশুটি এনআইসিইউতে রয়েছে।

ওপরের এ তথ্যগুলো দিয়ে নবজাতকের ছোট চাচা মো. আলমগীর গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের (চাইল্ড কেয়ার) কথাবার্তায় সন্দেহ ছিল। কিন্তু ওই সময় আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। মারা গেছে বলাতে আর গ্যাকেট খুলে দেখিনি। বাড়িতে গিয়ে গোসল করানোর পর বাচ্চা দেখে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটা আমার ভাতিজি না। এই ঘটনার জন্য ওই হাসপাতাল দায়ী। আমাদের মনে হচ্ছে তারা পাচারের জন্য এই ঘটনা সাজিয়েছে। আমরা বিচার চাই। থানায় অভিযোগ করেছি।’

পাঁচলাইশ মডেল থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘চাইন্ড কেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। আমাদেরকে অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্ত করে ঘটনাটি আমরা উদ্ঘাটন করেছি। ওই পরিবারকে তাদের জীবিত সন্তান আমরা বুঝিয়ে দিয়েছি।’ ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে বলেছে, ‘১০ মিনিটের ব্যবধানে দুইটা নবজাতক ভর্তি করা হয়। একটি ১৩-তে আর একটি ১৭-তে। ১৩-এর বাচ্চা ১৭ নম্বরে গেছে আর ১৭-এর বাচ্চা ১৩-তে এসেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, ‘আমরা হাসপাতাল থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছি। কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘এটা আসলে সম্পূর্ণ ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কারণ ১০-১৫ মিনিট আগে-পরে একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে নবজাতক ভর্তি হয়েছিল।’

সন্তানকে ফিরে পেয়ে খুশি মা রোকসানা আক্তার (২২)। তিনি বলেন, ‘একজন মা মিথ্যে বলে না। আমিও মিথ্যা বলিনি। আমি খুশি। দুবাইতে থাকা ওর বাবাও (মহিউদ্দিন) খুশি।’ রোকসানা আক্তার বলেন, ‘ওই শিশুর মরদেহ নিয়ে আমরা সারা রাত অ্যাম্বুল্যান্সে বসেছিলাম থানার সামনে। ভোররাতে আমাকে জানানো হয় আমার মেয়ে পাওয়া গেছে। এনআইসিইউতে পাশের সিটের শিশুর সঙ্গে নাকি বদল হয়েছে। আজ সকালে একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে ছেলের মরদেহ নিয়ে যায়, পরে আমার মেয়েকে ফেরত দেয় চাইল্ড কেয়ার থেকে। তখন পুলিশ ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে তা যেন আর কোনো মায়ের সঙ্গে না করা হয়। ওদের এনআইসিইউতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তারা হয়তো আমার বুকের ধনকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল। এ ধরনের ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আমি এ ঘটনায় জড়িত ডাক্তারসহ চাইল্ড কেয়ারের শাস্তি চাই।’

রয়েল হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তিকৃত নবজাতককে (মেয়ে) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ডা. বিধান রায়। তিনি বলেন, ‘শিশুটি বেশ অসুস্থ। জন্মের পর ব্রেনে অক্সিজেন পৌঁছেনি। খিঁচুনি ও ইনফেকশন আছে। আমরা মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’

জানা যায়, নোয়াখালীর মাইজদীতে গত ১৩ এপ্রিল রোকসানা স্বাভাবিক প্রসবে একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন। অসুস্থতার কারণে শিশুটিকে প্রথমে নোয়াখালীর মা-মণি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে নিউমোনিয়া ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে পরিবার। পরদিন সন্ধ্যায় চাইল্ড কেয়ার ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।

নবজাতক পরিবর্তনের ঘটনাটি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) স্যারের সঙ্গে আলাপ করে আমরা একটি তদন্ত কমিটি করব। ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।’

নগরের প্রবর্তক এলাকার ট্রিটমেন্ট সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় ‘চাইল্ড কেয়ার’ বেসরকারি হাসপাতালটি অবস্থিত।

image_printপ্রিন্ট

শেয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।