আর এক মুঠ সুপারি সুন্দরী সুনিশ্চয়

সংস্কৃত সুন্দর শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ সুন্দরী। অভিধানে সুন্দরী শব্দের অর্থে বলা হয়েছে রূপবতী। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘রূপবতী রমণী’ অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছেন (স্বরে বুঝিতেছি এ প্রশ্ন কোন সুন্দরী করিলেন)।

অন্যরাও প্রায় একই অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেন (ভৈরবী দুই সুন্দরী তুই কান্তিমতী রাজরাণী- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; না কর সুন্দরী রাধা আল জজ্ঞাল, অমিআঁ বরিষে তোর নয়ন বিশাল- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন; পাষাণ কবর বোরকা খোল দেখব তোমার সুন্দরী- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; মধাব সোঙরিতে সুন্দরী ভেলি মাধাই- বিদ্যাপতি; তারপর এক রাতে স্বপনে দেখিল সুন্দরী, দীঘির পানিতে আছে এক রাজপুরী- ভেলুয়া সুন্দরীর পুঁথি; পরমা সুন্দরী বন্যা নতুন যৌবনি- সৈয়দ আলাওল; সুন্দরীর ললাটের সিন্দুরবিন্দু দেখিয়া তাঁহারা ঊষার সীমন্ত-শোভা তরুণ তপনের নিন্দা করেন, রাগে সূর্য্যদেব, পৃথিবী দগ্ধ করিয়া চলিয়া যান- কমলাকান্তের দপ্তর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; সুন্দরী সে প্রকৃতিরে জানি আমি মিথ্যা সনাতনী, সত্যেরে চাহি না তবু সুন্দরের করি আরাধনা- মোহিতলাল মজুমদার; ইবনে বতুতা পরম খুশি হয়েছিলেন এক টাকায় দুজন সুন্দরী মেয়ে কিনতে পেরে- ঐতিহাসিকের নোটবুক, ড. সিরাজুল ইসলাম)।

সুন্দরী শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সু +উন্দ্ + অর + ঈ।

সংস্কৃত সিন্দূর থেকেও বাংলায় সুন্দরী শব্দটি এসেছে। এ সুন্দরী শব্দের অর্থ সুঁদরি গাছ। সুন্দরবন এ সুঁদরি বা সুন্দরী গাছের জন্য বিখ্যাত। সুন্দরি বানানভেদ।

আবার সংস্কৃতে সুনিশ্চয় বিশেষ্য। এটার অর্থ সন্দেহাতীত বলে জ্ঞান বা বোধ, উত্তম রূপে নির্ধারণ। কিন্তু বাংলায় শব্দটি বিশেষণ এবং এটার অর্থ সুনিশ্চিত (অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজপুত্র হয়, অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!- বারাঙ্গনা, কাজী নজরুল ইসলাম; সে যদি সম্মত হয়, জেনো সে সম্মতি আমার স্বীকার-বাক্য স্থির সুনিশ্চয়- রোমিওজুলিয়েত, উইলিয়াম শেকসপিয়র, অনুবাদ হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)।

আবার ক্রিয়া-বিশেষণ হিসেবে বাংলায় সুনিশ্চয় মানে সঠিকভাবে, অতি অবশ্য। সুনিশ্চয় শব্দের গঠন হচ্ছে সংস্কৃত সু + নিশ্চয়।

এদিকে শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, বাংলা ভাষায় সুপারি শব্দটি বিদেশী ভাষার দান। গুয়া বা সুপারি এক সময় ভারতের সোপর বা সুর্পরক বন্দর হয়ে বিদেশে যেত। আরবীয় বণিকদের ধারণা ছিল এটা সোপর বা সুর্পরক বন্দরের ধারে কাছেরই ফল। এ কারণে তারা গুয়ার নাম দেয় সোপারা। তাদের দেয়া এ নাম বিবর্তিত হয়ে এখন সুপারিতে এসে ঠেকেছে (পান সুপারি। পান সুপারি। এইখানেতে শঙ্কা ভারি- সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; মাঠে কিনারে সেই সুতনুকা সুপারীর গাছ- আবদুল গনি হাজারী; সুপারি কাটার শার্তার আওয়াজ বন্ধ করিয়া তিনি বলিলেন- আবুল মনসুর আহমদ; সারি দেওয়া সুপারির আন্দোলিত সঘন সবুজে- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সুপারি কাটার যাঁতির মত জামধর মোগল ছবিতে দেখেছিলুম- সৈয়দ মুজতবা আলী)। বলা যেতে পারে, ভারতের বহিঃবাণিজ্যের প্রাচীন প্রমাণ হচ্ছে ‘সুপারি’ শব্দটি। সুপুরি ও সুপারী বানানভেদ (মাঠের কিনারে এ পর্যদস্ত সুপারীর লিকলিকে গাছ- আব্দুল গনি হাজারী; নেগরি নাপিত সুপারীর খোলের তৈরি ক্ষুরের চামটি হইতে নরুন বাহির করিয়া- আবুল মনসুর আহমদ)।

নেপালিরাও আমাদের মতোই সুপারি বলে। আবার এটা অসমে গুয়া, বার্মিজে কুরআ, মালদ্বীপে ফুবাহ, হিন্দিতে সুপারি, ইন্দোনেশিয়ায় পিনাং, জাভায় জেমবি, কম্বোডিয়ায় লুয়ুস, খেমারে কগ, উড়িয়ায় গুয়া, তাইওয়ানে বিনলেঙ, থাইল্যান্ডে মাক, উর্দুতে চালিয়া, ভিয়েতনামে কাউ নামে পরিচিত। আর পশ্চিমা বিশ্বের ডাচে betelnoot, জার্মানে betelnuss, ইতালিয়ানে noce di betel, নরওয়েজিয়ানে betel mutter, পর্তুগিজে noz de betel, স্পেনিশে areca এবং সুইডিশে betelnöt নামে পরিচিত।

শুকনো সুপারি জাঁতি নামের একটি যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়। এটা বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় ‘সরতা’ নামে পরিচিত হলেও শব্দটি বাংলা নয়, হিন্দি। এটা মারাঠিতে আদাকিত্তা, মালয়ালম ও তামিলে পাককুভেত্তি, কানাড়িতে আদেকি কাত্তারি, তেলেগুতে আদাকাত্তেরা, গুজরাটিতে সুরি ও সিংহলিজে গিরায়া নামে পরিচিত।

image_printপ্রিন্ট

শেয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।