১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭      

English Version

ডলার নিয়ে ভয়াবহ কারসাজি

অনলাইন ডেস্ক
ডিসে. ৭, ২০১৭ সর্বশেষ আপডেট ০:৪৪

সিন্ডিকেটের কব্জায় ডলার নিয়ে চলছে ভয়াবহ কারসাজি। বিশেষ গোষ্ঠী হুন্ডির মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে টাকার বিপরীতে হু হু করে দাম বেড়ে চলেছে ডলারের। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থ। সেকেন্ড হোম, হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে এসব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রাসাদ গড়ে তুলছে চিহ্নিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। অনেকে বাণিজ্যিক ভবনও ক্রয় করছেন। আবার কেউ কেউ ভুয়া এলসি অথবা ওভার ইনভয়েস করে অর্থ পাচার করছেন বিভিন্ন দেশে। এমনকি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুরোটাই অনেকে দুবাই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে পাঠিয়ে দিয়েছেন এমন নজিরও অনেক। জানা গেছে, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যাংক থেকে মেরে দেওয়া পুরো টাকাটাই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুবাইতে। একইভাবে রূপালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শোধ না করে ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে দেওয়ার কয়েকটি নজির রয়েছে। জামালপুর বাড়ি এমন একজন ব্যবসায়ী বেসিক ব্যাংক থেকে নেওয়া পুরো ১০০ কোটি টাকাই পাঠিয়ে দিয়েছেন মালয়েশিয়ায়। এই ব্যবসায়ী এখন মালয়েশিয়াতেই অবস্থান করছেন। শুধু তা-ই নয়, নিত্যনতুন কায়দায় বিদেশে অর্থ পাচার চলছে। এই চক্রগুলো টাকা পাঠায় হুন্ডি করে। আবার আরেক গ্রুপ ভুয়া ও জাল এলসি খুলে টাকা পাঠিয়ে দেয় বিভিন্ন দেশে। বেশ কয়েকজন গার্মেন্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করে কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেয় না এদের বিরুদ্ধে।সূত্রমতে, বারোয়ারি বিভিন্ন চক্রের খপ্পরে পড়ে ডলার নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে দেশে। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে ডলারের। সর্বশেষ গতকাল খোলাবাজারে ডলারের রেট ছিল ৮৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেট ৮২.৪০ টাকা হলেও কেউই তা মানছে না। বরং বিভিন্ন ব্যাংক তথ্য গোপন রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। আবার কয়েকটি ব্যাংক পরিকল্পিতভাবেও রেট বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা এর মধ্যে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে তিনটি বিদেশি ও ১৭টি দেশীয় ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে নোটিসও প্রদান করেছে। তিন দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নোটিসের জবাব এখনো কেউ দেয়নি। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, চিহ্নিত চক্রের কবলে পড়েছে ডলারের বাজার। এদিকে বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। একই সময়ে বাজার থেকে কোনো ডলার কেনার প্রয়োজন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ গত অর্থবছর বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে ও বাজার নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) জরুরি বৈঠক করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্য কারসাজিতে জড়িত চিহ্নিত ২০টি ব্যাংককে নোটিসও করা হয়েছে। এরপর নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডলারের বাজার।সূত্রমতে, কয়েকটি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলারের প্রকৃত বিক্রয় মূল্যের তথ্য গোপন করছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে রেট দিচ্ছে, এর চেয়ে কমপক্ষে দুই টাকা বেশি দরে ডলার বিক্রি করছে আমদানিকারকদের কাছে। আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অন্যদিকে আমদানিকারকদের পাশাপাশি সাধারণ বিদেশগামী রোগীরাও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের আমদানিপণ্যের দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কেননা ডলারের দাম বাড়াতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডলারের বাজার এখনই স্থিতিশীল করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সূত্র জানায়, একটি সিন্ডিকেট খুবই পরিকল্পিতভাবে ডলারের দাম বাড়াচ্ছে। সিন্ডিকেটটি দেশের বাইরে ডলার পাচারও করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এ বিষয়ে ইতিমধ্যে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। পাচারকারীদের তথ্য পেতে কাস্টমস অফিসসহ বিভিন্ন দফতরের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির আড়ালে হুন্ডি হচ্ছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিদেশে চিকিত্সা নিতে যাবেন এমন কারও পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না সেদিকেও তীক্ষ দৃষ্টি রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, কয়েক দিন আগে একাধিক রোগী ডলার এনডোর্সের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করেছেন। গত কয়েক দিনে ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরগামী একাধিক রোগী বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। সেখানে কয়েকটি ব্যাংকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছে। সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। তিনি বলেন, ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে গতকালও ৮৪-৮৫ টকায় ডলার কিনতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তবে ব্যাংকগুলো তাদের ওয়েবসাইটে বিক্রি দেখিয়েছে সাড়ে ৮২ টাকা থেকে ৮৩ দশমিক ৬০ পয়সা। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, গতকালও প্রতিটি ডলার বিক্রি হয়েছে ৮২ দশমিক ৪০ টাকায়। আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ডলারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে তারা বিপাকে পড়েছেন। এতে আমদানি খরচ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বাজারে ডালারের সংকট তো রয়েছেই। ব্যাংকগুলোতে পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার কমেছে বলে জানা গেছে। আমদানিপণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা করছেন আমদানিকারকরা। বাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। একই সময়ে বাজার থেকে কোনো ডলার কেনার প্রয়োজন হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের। অথচ গত অর্থবছর বাজারে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিক্রির বিপরীতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার ক্রয় করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হঠাৎ করে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এতে কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অন্য ব্যাংকারদের সচেতন হতে হবে। যদি কারও বিরুদ্ধে কারসাজির তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডলারের মূল্য নিয়ে কেউ কারসাজি করেছে বা করছে এটা যদি চিহ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে সবার আগে সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারক ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। ব্যাংকগুলো যে রেটে ডলার বিক্রি করে আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে রেট সরবরাহ করে, তা আরও কঠোরভাবে তদারক করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। ডলারের মূল্য বাড়লে সবার আগে এর প্রভাব পড়বে আমদানি খাতে, যা সব ধরনের আমদানিপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।